‘আজ চললাম, আবার দেখা হবে’, বিশপ লেফ্রয় রোডের বাড়ি আর অপুর চলে যাওয়া…


হাইলাইটস

  • এসেছিলাম স্রষ্টার জন্মদিনে, কিন্তু এতো সৃষ্টি আমায় হৃদকম্প বাড়িয়ে দিয়ে ঢুকে গেলেন।
  • একটা পা বাড়িয়ে ঢুকছি, পাশ দিয়ে দেখি এক কালো টি-শার্ট পরিহিত ভদ্রলোক ঢুকছেন।
  • বলতে বলতেই ললিতা দেবী (সন্দীপ রায়ের স্ত্রী) পান্তুয়া নিয়ে হাজির।

অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায়

বিশপ লেফ্রয় রোডের বাড়িটার সামনে ১০ মিনিট ধরে পায়চারি করছি ক্যামেরার ব্যাগ কাঁধে, কিছুতেই আর ভিতরে ঢুকে উপরের তলায় যাবার সাহস করতে পারছি না। পেটের মধ্যে কেমন গুড়গুড় করছে। ওই কিংবদন্তি মানুষটি নেই বটে কিন্তু বাড়িটার সঙ্গে তো সত্যজিত রায়ের নাম জড়িয়ে আছে। তার ওপর ওই কিংবদন্তির জন্মদিন। যাই হোক কোনও রকমে ওপরে উঠলাম, মনে হচ্ছিল বিশাল এক প্রাসাদ আমায় গিলে খাচ্ছে। কিন্তু একি এতো উম্মুক্ত লম্বা লাল মেঝের গালিচায় অবাধ প্রবেশ। একটা পা বাড়িয়ে ঢুকছি, পাশ দিয়ে দেখি এক কালো টি-শার্ট পরিহিত ভদ্রলোক ঢুকছেন। এ বার যেটুকু হাত পা গরম ছিল ঠান্ডা হতে শুরু করে দিল। এসেছিলাম স্রষ্টার জন্মদিনে, কিন্তু এতো সৃষ্টি আমায় হৃদকম্প বাড়িয়ে দিয়ে ঢুকে গেলেন।

সম্বিৎ ফিরলো এক গম্ভীর আওয়াজে ‘কোনও কাজে এসেছ ভাই?’, সত্যজিৎ পুত্র সন্দীপ (বাবুদা )-এর প্রশ্ন। বললাম, ফ্রিল্যান্স করি শুনেছিলাম ওঁর জন্মদিনে সবাই আসতে পারেন, তাই ছবির লোভে এসেছি। ‘আচ্ছা কী নাম? এসো এসো’… আমার তখনও ঘোর কাটছে না। এত সহজ, এত সরল, এত আন্তরিক হওয়া সম্ভব? হ্যাঁ, সম্ভব বলেই সত্যজিৎ রায় একটি অধ্যায়, একটি পথ যার পাঁচালি আজও মানুষ ঘরে ঘরে গেয়ে চলেছেন।

এবার দেখলাম অপুকে। তাঁর সংসার তো আগেই অনুভব করেছি, মজ্জায় মজ্জায় ঢুকে গিয়েছে ‘অপরাজিত’ মানুষটি। ঘরে ঢুকতেই দেখি কিছু একটা কথায় হো হো করে হাসছেন, এ তো ঝিন্দের বন্দির ময়ূরবাহন। হাসি থামলে সাহস করে আলাপ করলাম। উদয়ন পন্ডিত বললেন, ‘ছবি তোলাতে তো বাধা নেই, এ বাড়িতে কখনও কোনও বাঁধন ছিল না, আজও নেই। তবে এই সিগারেট খেলে সেটা তুলে কিন্তু কাগজে ছাপতে দিও না যেন।’

বলতে বলতেই ললিতা দেবী (সন্দীপ রায়ের স্ত্রী) পান্তুয়া নিয়ে হাজির। আর এক প্রবাদপ্রতিম হারাধন বন্দ্যোপাধ্যায় সিগারেট নিতে যেই সৌমিত্রবাবুর কাছে গেলেন, সঙ্গে সঙ্গে আবার সেই হাসি ‘পান্তুয়া পছন্দ হল না, সেই সিগারেট।’ তার পর এক অদ্ভুত পরিবেশের সাক্ষী রইলাম। যখন সত্যজিৎ রায়ের ঘরে প্রচুর ছবির মাঝে উনি গিয়ে দাঁড়ালেন, মনে হচ্ছি ‘মানিক’ সাগরে এক ঐশ্বরিক প্রতিভা এক এক করে রত্ন সঞ্চয়ন করে অর্ঘ্য সাজিয়ে দিচ্ছেন।

.

.

.

.

.

.

.

অশনি সংকেতের গঙ্গাচরণের স্পর্শ অনুভব করলাম, যখন দেখলাম উনি অত্যন্ত অসুস্থ সত্যজিৎ-পত্নী বিজয়া রায়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিলেন। প্রশস্ত ঘরের কোনায় পুরনো সন্দেশ পত্রিকাগুলি যখন উল্টেপাল্টে দেখছিলেন মনে হচ্ছিল আমার সামনে ফেলুদা গভীর বিষয়ে চিন্তামগ্ন। নিজেকে তোপসে ভাবতে বেশ লাগছিল তখন। ঘোর ভাঙল শাখা-প্রশাখার মানসিক অবসাদগ্রস্ত প্রশান্ত মজুমদার আর ডিঙ্গোর আলাপচারিতায়। মনে পড়ছিল ডিঙ্গোর বিখ্যাত ডায়লগ, ‘দাদু তুমি এক নম্বরি জানো দুনম্বরি জানো।’ আর প্রশান্ত রূপে সৌমিত্রবাবুর মানসিক রুগীর অভিনয় এখনও গায়ে কাঁটা দেওয়ার পক্ষে যথেষ্ট।

বেলা গড়িয়ে চলল, হঠাৎ নর সিং তাঁর অভিযান শেষ করে বললেন ‘আজ উঠি’ …। সবাই এগিয়ে দিতে এলেন, বেরোবার সময় হাতে একটা ছোট্ট ব্যাগ নিয়ে বলে গেলেন ‘চললাম, আবার দেখা হবে’। সাক্ষী রইলেন এক বড় ফ্রেমে বাঁধানো সুকুমার রায় আর সামনে থেকে ক্যামেরা হাতে এই অধম।

সব ছবি লেখকেরই তোলা।

আরও পড়ুন: সৌমিত্রের মতো সব বিষয়ে এত ভালো বক্তা আমি তো আর কাউকে চিনি না: শর্মিলা ঠাকুর

এই সময় ডিজিটালের বিনোদন সংক্রান্ত সব আপডেট এখন টেলিগ্রামে। সাবস্ক্রাইব করতে ক্লিক করুন এখানে।



Continue Reading

You might also like

Leave A Reply

Your email address will not be published.