উত্তমের স্ত্রীর তাড়া খেয়ে রাস্তায় সৌমিত্রর চিৎকার, ‘পাগলি হ্যায়, বাঁচাও’


ভবানীপুরের বিখ্যাত চট্টোপাধ্যায় পরিবারে আর এক বিখ্যাত চট্টোপাধ্যায়ের প্রয়াণে শোক ও স্মৃতি একাকার। উত্তমকুমারের বাড়িতে তাঁর পুত্রবধূ, নাতি, নাতনিদের সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে নিয়ে কত স্মৃতি! শুনলেন সুমিত দে

‘টুনটুনি বৌদির হাতের রান্না ছাড়া, আমি অন্য কারও হাতে রান্না খাবই না।’ ‘ঝিন্দের বন্দি’র শ্যুটিং করতে গিয়ে রাজস্থানের উদয়পুরে বায়না ধরেছিলেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়।

কার কাছে জানা গেল এই তথ্য?

সেই আউটডোরের স্মৃতিচারণা করছিলেন স্বয়ং উত্তম কুমারের পুত্রবধূ মহুয়া চট্টোপাধ্যায়। ‘টুনটুনি বৌদি’ কে?

ফর্সা-গোলগাল উত্তমকুমারের স্ত্রী গৌরীদেবীকে এই নামেই ডাকতেন সৌমিত্র। আর উত্তমের প্রিয় বন্ধু ডাক্তার লালমোহন মুখোপাধ্যায়ের স্ত্রী, শান্ত স্বভাবের হাসিখুশি দেবী মুখোপাধ্যায় ছিলেন তাঁর ‘চুপচাপ বৌদি’। দু’জনের একসঙ্গে প্রথম ছবি তপন সিংহের ‘ঝিন্দের বন্দি’র আউটডোর করতে গিয়ে, টানা ২১ দিন উদয়পুর কাটিয়েছিলেন উত্তম-সৌমিত্র। সঙ্গে ছিলেন ছবির অন্য অভিনেতা তরুণকুমার, দিলীপ রায়। সঙ্গী লালমোহন এবং দেবী। নানা গল্প বলছিলেন মহুয়া। সেখানে বোঝা গেল, উত্তমের স্ত্রীর সঙ্গে কী চমৎকার বৌদি-দেওরের সম্পর্ক ছিল সৌমিত্রের। সৌমিত্রের এক শ্যালকের বন্ধু ছিলেন উত্তম। সেই সূত্রেই সৌমিত্রের বোনের বিয়েতে নিমন্ত্রিত হিসেবে গিয়েছিলেন উত্তমকুমার। সেই প্রথম দুজনের দেখা। কিন্তু দুজনের পরিচয়-ভালোলাগা-ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠে ‘ঝিন্দের বন্দি’ করতে গিয়েই। মহুয়ার কথায়, ‘শ্যুটিংয়ের অবসরে বসতো বিয়ারের আসর। আর তাতে সৌমিত্রকাকুর বায়না ছিল, মাছ ভাজা করতে হবে ‘টুনটুনি বৌদি’-কে। শুধু মাছ ভাজাই নয়, মাছ-মাংস-ভাতও সকলকে রান্না করে খাওয়াতেন গৌরীদেবী।’

আউটডোরে অন্য সময়ে বসত তাসের আসর। টাকা বাজি রেখে টোয়েন্টি নাইন খেলা। যে জিতবে, সে খাওয়াবে বিকেলের মুড়ি-সিঙ্গাড়া। উত্তমকুমারের তেমন তাস-প্রীতি না থাকলেও, খেলার আসরে পার্টনার হতেন সৌমিত্র-দেবী। অন্যদিকে তরুণকুমার-গৌরীদেবী। সেই খেলায় প্রায়শই সৌমিত্র তাস টেনে ‘চুরি’ করে দান দিতেন। ব্যাপারটা একবার গৌরীদেবী ধরে ফেলতেই খেলা ছেড়ে উঠে তাড়া করেন সৌমিত্রকে। দুজনেই ছুটছেন বড় রাস্তা দিয়ে। সক্কলে হাঁ করে চেয়ে। ছুটতে ছুটতে সৌমিত্র পিছনের গৌরীদেবীকে দেখিয়ে সকলকে বলছেন, ‘আরে ইয়ে পাগলি হ্যায়, পাগলি হ্যায় বাঁচাও।’

বাংলা ছবির দুই জনপ্রিয়তম অভিনেতার সম্পর্ক নিয়ে বাঙালির আড্ডায় যত জল্পনা হোক, উত্তমের বাড়ির অধিকাংশ সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে বোঝা গেল, ও সব জল্পনা অর্থহীন। সবাই বলছেন, দু’জনের সম্পর্ক ছিল খুব ভালো। সেই সম্পর্কের জেরেই উত্তমের গিরীশ মুখার্জি রোডের বাড়ির লক্ষ্মীপুজোয়, তরুণকুমারের বিয়েতে, উত্তমের ছেলে গৌতমের বিয়েতে, উত্তমের নাতি অভিনেতা গৌরবের পৈতেতেও নিমন্ত্রিত হয়ে এসেছেন সৌমিত্র। প্রতি বছর নিয়ম করে পয়লা বৈশাখ, বিজয়ায় উত্তমকে প্রণাম করতে কখনও ভুল করতেন না তিনি। তরুণকুমারের নাতি সৌরভের সঙ্গে ‘পাতালঘর’, ‘বাইসাইকেল কিক’-এ অভিনয় করেছেন সৌমিত্র। সৌরভ কথায় কথায় বলছিলেন, ‘পাতালঘর’-এর প্রিমিয়ারে একে একে সবাইকে মঞ্চে ডাকা হচ্ছিল। শেষে সিটে বসে একমাত্র আমি আর সৌমিত্রজেঠু। হাসতে হাসতে উনি বললেন, ‘এ বার কার ডাক পড়ে দেখি’। তারপর সৌমিত্রজেঠুর ডাক পড়ায় আমি শেষে মঞ্চের এক কোণে গিয়ে দাঁড়াতে, উনি মঞ্চে সকলের মাঝে আমাকে কাছে ডেকে নিলেন। বললেন, ‘আরে, ওই-ই তো ছবির প্রধান চরিত্র, ওকে তো মাঝখানে রাখতেই হবে।’

সৌমিত্রের সঙ্গে ‘আইপিএস অফিসার’ ফিচার ফিল্মে কাজ করেছেন উত্তমের নাতনি নবমিতা। নবমিতা ফোনে বলছিলেন, ‘কিছুদিন আগে একটা প্রোডাকশনের কাজে গিয়েছিলাম ওঁর বাড়ি। কাজের কথা সেরেই, আমার সঙ্গে গল্প জুড়লেন প্রায় ঘণ্টা দেড়েক। সেই গল্পে দাদুর কথা, দাদুর সঙ্গে ‘ঝিন্দের বন্দি’, ‘স্ত্রী’, ‘দেবদাস’ ছবিতে একসঙ্গে কাজের কথা বলেছিলেন। দাদুর আমার ‘নবমিতা’ নাম রাখা নিয়ে অনেক গল্প শুনিয়েছিলেন।’ দুই মহানায়কের সুন্দর স্মৃতি আদৌও মুছে যায়নি উত্তম-পরিবারের কারও মন থেকে। তরুণকুমারের কন্যা ঝিমলি বন্দ্যোপাধ্যায় বলছিলেন এক মজার ঘটনা। ‘সৌমিত্রজেঠু প্রায়ই উত্তমকুমারকে বলতেন, তুমি তো রোজ সকালে হাঁটো, ব্যায়াম করো। বুড়োকেও (তরুণকুমার) একটু সকালে উঠিয়ে হাঁটাতে পারো তো। ও দিন দিন মোটা হচ্ছে।’

একদিন ভোরবেলা উত্তমকুমার গাড়ি নিয়ে সোজা পৌঁছে যান সৌমিত্রজেঠুর বাড়ির কাছে। গিয়েই হাঁক দিয়েছেন উত্তমকুমার, ‘পুলু, শিগগিরি নীচে নেমে আয়।’ সৌমিত্রজেঠু নীচে নেমে আসতে উত্তমকুমার বলেন, ‘যা গাড়িতে দেখ।’ সৌমিত্রজেঠু গাড়ির কাচের ভিতরে দেখেন, গাড়ির ভিতরে নাক ডেকে ঘুমোচ্ছেন তরুণকুমার। সেই দেখে দুজনেই হেসে গড়াগড়ি।’ উত্তম চলে গিয়েছেন হল ৪০ বছর। সৌমিত্রর চলে যাওয়া সেই স্মৃতি উস্কে দিয়েছে বাঙালির। ভবানীপুরে উত্তমকুমারের বাড়িও যেন একসঙ্গে দুই শোকের শরিক।

এই সময় ডিজিটালের বিনোদন সংক্রান্ত সব আপডেট এখন টেলিগ্রামে। সাবস্ক্রাইব করতে ক্লিক করুন এখানে



Continue Reading

You might also like

Leave A Reply

Your email address will not be published.