এই প্রজন্মের তরুণদের আইকন হতে পারে স্নিগ্ধ

বর্তমানে ডিজিটাল যুগে সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যাণে আমরা অনেক সময় অনেক নিউজ দেখে থাকি, ক’জনি বা আমরা সে খবর মনে রাখি? অথবা জীবনে চলার পথে অনেক সময় অনেকের সাথে পরিচয় হয়ে যায়, ক’দিনই বা আমরা তাদের কথা মনে রাখি? কিন্তু আজকে আমরা এমন একজন তরুনের সাথে আপনাদের পরিচয় করিয়ে দিব যার সম্পর্কে জানলে হয় তো আপনারও ইচ্ছে হবে হতাশাকে পেছনে ফেলে জীবনে সফলতা অর্জন করার।

ব্যর্থতার ছাই থেকে সাফল্যের প্রাসাদ গড়ে উঠে এমন উদাহরণ আছে অসংখ্য। নতুন চিন্তা, দক্ষতা, মেধা আর উদ্যমই পৌঁছে দেয় সাফল্যে। তেমনি ভাবে জীবনকে তিল তিল করে গড়ে তুলতে পেড়েছেন এই প্রজন্মের তারকা মির্জা তাওসীফ শরীফ।

সব সময় নিজেকে আড়ালে রাখতে পছন্দ করা মানুষটি আড়ালে রাখতে পারেননি তার প্রতিভা। যেখানেই হাত দিয়েছেন পেয়েছেন সফলতা। লেখাপড়া, সংস্কৃতি, খেলাধুলা থেকে গণিত প্রতিযোগিতা সবখানেই পেয়েছেন সফলতা। পরিবার পরিজনের কাছে যদিও তিনি স্নিগ্ধ নামে পরিচিত। নিজের ব্যক্তিত্বকে সবার মাঝে থেকে একটু অন্যভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন ময়মনসিংহে বেড়ে উঠা বাংলাদেশী এই তরুণ। বর্তমানে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক। শখের বসেই বাবার হাত ধরে গণিতের দুনিয়ায় তার পথচলা। কিন্তু কে জানত সেই শখ তাকে নিয়ে যাবে গণিত অলিম্পিয়াডের মতন অঙ্গনে। ২০০৫ থেকে শুরু হয় তার এই অঙ্গনের যাত্রা।

চেষ্টা যে মানুষকে কতদূর নিতে পারে তার দূর্দান্ত উদাহরণ হয়তো হতে পারেন এই তরুণ।
সফলতার বিভিন্ন বিষয় নিয়ে গল্পে আড্ডায় এই এক্সক্লুসিভ ইন্টারভিউ টি নিয়েছেন আমাদের আনন্দ ভূবন ম্যাগাজিনের বিশেষ প্রতিবেদক আকন্দ মিফতাহুল জান্নাত।

ছবি : স্নিগ্ধর ফেইসবুক থেকে নেওয়া।

মিফতা : কেমন আছেন?
স্নিগ্ধ: আলহামদুলিল্লাহ চলছে।
প্রথম প্রশ্নেই জানতে চাই “সব সফলতা কি স্নিগ্ধর জন্য?”
স্নিগ্ধ: হাসি মুখে এক কথায় উত্তর দিলেন, নিজের স্বপ্ন পূরণ করতে পারার নামই আমার জন্য সফলতা।

মিফতা : আপনার জীবনে গণিত অলিম্পিয়াডের যাত্রাটা কেমন ছিলো?
স্নিগ্ধ: বাবা গণিতের শিক্ষক। ছোটবেলায় যখন উনি অন্য শিক্ষার্থীদের পড়াতেন তখন খুব জ্বালাতাম। তাই বাবা ছোট ছোট গণিতের সমস্যা দিয়ে আমাকে এবং আমার ভাইকে বসিয়ে দিতেন। এভাবেই শুরু হয় গণিতের প্রতি ভালোবাসা। ২০০৫ এ যখন প্রথম গণিত অলিম্পিয়াডের মতো যায়গায় যাওয়ার সৌভাগ্য হয়। তখন হাজারো অপরিচিত মানুষের মধ্য থেকে যখন সৌভাগ্যক্রমে সর্বচ্চো নাম্বার পাওয়ার গৌরব অর্জন করতে পারি তখন থেকেই কয়েক বার সরু লাইনের মাঝে দৌড়ে গিয়ে স্টেইজে উঠে লাল ফিতার মেডেলটি গলায় ঝুলানোর আকাঙ্ক্ষা আরো তীব্র হতে থাকে। ২০০৫ সাল থেকে প্রাইমারি ক্যাটাগরিতে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার মধ্য দিয়ে শুরু হয় এই সাফোল্যের যাত্রা। যার ধারাবাহিকতা বজায় থাকে ২০১০ সাল পর্যন্ত।

মিফতা : সংস্কৃতি পাড়ায় আপনার প্রতিভার ঝলক সম্পর্কে জানত চাই?
স্নিগ্ধ: নতুন কুঁড়ি মধ্য দিয়ে সংস্কৃতি পাড়ায় পথ চলা। এর পরে শাপলা কুঁড়ি, পদ্ম কুঁড়ি, জাতীয় শিশু-কিশোর বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় গান, আবৃত্তি, উপস্থিত বক্তিতা, দেশাত্ববোধক গান, গজল, কোরআন তিলাওয়াত, পল্লীগীতি সবকিছু করেছি। পেয়েছি সফলতার পুরস্কার।

মিফতা : এত সফলতার মধ্যেও আপনার আরেক সফলতা শিক্ষা ক্ষেত্র, বাদ যায়নি খেলাধুলাতেও। সেখানেও ক্যারম, টেবিল টেনিসের বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় সফলতা পেয়েছেন। খেলাধুলার যাত্রাটা পাঠকদের জানাবেন কি?

স্নিগ্ধ -ময়মনসিংহ শহরে বেড়ে উঠা। খেলাধুলায় আগ্রহ দেয়ার মতন তেমন কেও ছিল না। ক্লাসের প্রথম সারির ছাত্র হিসেবে সবার ধারণা থাকতো আমিও হয়তো একদম ফিটফাট হয়ে ক্লাস করবো। কিন্তু ক্লাসের টিফিন টাইম একমাত্র ছিল আমার অনুশীলনের সময়। ৩০ মিনিট এর সময়টুকু কে এক মিনিট মিস করতাম না। তাই সবার এক্সপেক্টেশন রক্ষা করাও একটু মুশকিল ছিলো কেন না ৩০ মিনিট অনুশীলনের পর নিজেকে ফিটফাট রাখাটাও বেশ চ্যালেঞ্জিং হয়ে যেত। তবু চেষ্টা করেছি। আর এভাবেই হয়ে গেলো।

অনুশীলন আর অধ্যবসায়ের জন্যই আজ স্নিগ্ধর সাফল্যের ঝুঁড়িতে আছে আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় ক্রীড়া সংস্থা আয়োজিত বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি গেমস। টেবিল টেনিস খেলে ২০১৪ সালে জাতীয় পর্যায়ে ব্রোঞ্জ মেডেল। এর পর টানা ২০১৫-২০১৮ পর্যন্ত সিলভার মেডেল অর্জনের রেকর্ড। সাফল্যের গল্পটা এখানেই শেষ নয়, টেবিল টেনিসের সঙ্গে দাবা, ক্যারমেও আছে তার সৌভাগ্যের মুকুট। জাতীয় পর্যায়ে ক্যারমে তিনি ২০১৫ তে অর্জন করেন ব্রোঞ্জ মেডেল। তারপর থেকে ২০১৬ – ২০১৮ পর্যন্ত গোল্ড ম্যাডেলের অর্জন তো আছেই। এতসব সাফল্যের মাঝে একটি কথা না বললেই নয়। তিনি বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে আন্তর্জাতিক মঞ্চও মাতিয়ে এসেছেন । ২০১৯ ( ইরানিয়ান জিয়োম্যট্রি অলিম্পিয়াড) ৫৩ টি দেশের মাঝে ব্রোঞ্জ মেডেল পেয়ে ওয়ার্ল্ড রেঙ্কিংয়ে নিজ ক্যাটাগরীতে ১২ তম হিসেবে নিজের জায়গা করে নিয়েছেন। স্কুল জীবন থেকে শুরু করে এই পর্যন্ত প্রতিটি দিন ছিলো স্নিগ্ধর জন্য একেকটি চ্যালেঞ্জ। ময়মনসিংহ জিলা স্কুলের ছাত্র ছিলেন তিনি। ২০১০ সনে বর্ষ সেরা ছাত্রের ম্যাডেল্টিও তার হাত ছাড়া হয়নি। নটরডেম থেকে কলেজ জীবন শেষ করেন তিনি। বুয়েট ( বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়) স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন এই দূর্দান্ত তরুণ। এমনকি আকাশ ছোঁয়া স্বপ্নোগুলোর মাঝে ‘‘বুয়েট ব্লু’’ উপাধিটিও তার হাতছাড়া হয়নি।

মিফতা : আমাদের তরুণ প্রজন্মের জন্য আপনার সফলতার মন্ত্রটা জানাবেন কি?
স্নিগ্ধ: এখন আমাদের প্রজন্মের সোশ্যাল মিডিয়ার উপর ঝোকটা কমিয়ে নিজের উপর ফোকাস করাটা খুব জরুরি। ফেসবুকে সময় নষ্ট না করে নিজের ক্যারিয়ার এবং পড়াশোনায় মনোযোগী হতে হবে। তাহলেই সফলতা আসবে।
মিফতা : এত এত সফলতা আর প্রতিভার মানুষটির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা জানতে চাই?
স্নিগ্ধ: আমার তিন ভাই। এর মধ্যে আমিও মুগ্ধ জমজ। আমার মতো আমার ভাইও বিভিন্ন প্রতিযোগীতায় সফলতা দেখিয়েছে। এবার আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি মিডিয়া পাড়ায় কিছু একটা করবো। ভবিষ্যতে স্নিগ্ধ ও মুগ্ধ জুটি দেখতে পাবেন দর্শকরা। গানের জগতে দুই জমজ ভাইয়ের নয়া জুটির মাধ্যমে নতুনত্বের স্বাদ পাবেন বলে আশা করছি।

মিফতা : আমরাও সেই অপেক্ষাতেই থাকলাম, ধন্যবাদ।
স্নিগ্ধ: আপনাকেও ধন্যবাদ।

You might also like

Leave A Reply

Your email address will not be published.