টিভির মিত্রও ছিলেন সৌমিত্র


সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় শুধুই সিনেমা ও থিয়েটারের ছিলেন না। টিভিতেও কাজ করেছেন প্রচুর। আজ বিশ্ব টেলিভিশন দিবসে সৌমিত্রের টিভিতে নানা কাজের সন্ধান দিলেন ভাস্বতী ঘোষ

সিনেমাহলের বিরাট পর্দা, তাঁকে মিস করছে প্রতিনিয়ত। কিন্তু ছোট পর্দাও বাদ যাচ্ছে না। একটু খতিয়ে ভাবলেই টের পাওয়া যাচ্ছে, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের কী অমোঘ টান ছিল বাংলা টেলিভিশনের ওপর। তারকারা সাধারণত টেলিভিশন বিমুখ হন।

কিন্তু সত্যজিৎ পুত্র সন্দীপ রায়ের কথায় স্পষ্ট হল, বড় পর্দা নাকি ছোট পর্দা, তা নিয়ে একেবারে মাথা ঘামাতেন না সৌমিত্র। বরং কী ধরনের কনটেন্ট তৈরি করা হচ্ছে টেলিভিশনের জন্য, সেটা পরখ করে নিতেন। সন্দীপের কথায়, ‘বাবার লেখা দু’ টো গল্প নিয়ে আমরা দু’টো কনটেন্ট তৈরি করেছিলাম টেলিভিশনের জন্য। একটা ‘জুটি’। অন্যটা ‘অম্বর সেন অন্তর্ধান রহস্য’। দ্বিতীয়টায় অম্বর সেনের ভূমিকায় অভিনয় করেছিলন সৌমিত্রদা। বেশ জনপ্রিয় হয়েছিল, এই কনটেন্ট দু’টো’।

সত্যজিৎ রায়ের গল্পকে ভিত করে তৈরি কনটেন্টের ওপর সৌমিত্রর আলাদা দুর্বলতা ছিল। কিন্তু টিভির জন্য মেগাধারাবাহিকের অংশ হতেও পছন্দ করতেন তিনি। লীনা গঙ্গোপাধ্যায় জানালেন, ২০১৩ সালে বাংলা টেলিভিশনে শুরু হওয়া ‘জল নুপূর’ ধারাবাহিকে একটি চরিত্র করেছিলেন সৌমিত্র। প্রসঙ্গত সৌমিত্রর সমসাময়িক মাধবী মুখোপাধ্যায় বা সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়কে নিয়মিত মেগা ধারাবাহিকে দেখা গিয়েছে করোনার আবহাওয়া শুরু হওয়ার আগে পর্যন্ত। তুলনায় অবশ্য সৌমিত্র টেলিভিশনের জন্য কম সময় বের করতে পারতেন।

দূরদর্শনের জন্য ‘দেনা পাওনা’-তে অভিনয় করেছিলেন সৌমিত্র। যা বাঙালির ড্রয়িংরুম আজও ভোলেনি। সৌমিত্রর সঙ্গে সেখানে ছিলেন দেবশ্রী রায় আর চিরঞ্জিৎ চক্রবর্তী। দেবশ্রীর স্মৃতিচারণায় উঠে এল, ‘আমরা তিনজন যাঁরা এই প্রোজেক্টটা করেছিলাম, তাঁরা তখন মূলত সিনেমা করি। কিন্তু ওটা এত পছন্দ ছিল, আমরা খুব মন দিয়ে কাজটা করেছিলাম। মাত্র আটটা এপিসোড। একটা করে সপ্তাহ দর্শক অপেক্ষা করে থাকতেন, নতুন এপিসোড করে আসবে, তার জন্য। এই চরিত্রটা পেয়ে আমি নার্ভাস হয়ে গিয়েছিলাম। পুলুদাকে গিয়ে জিজ্ঞেস করি, কীভাবে করব। পুলুদা বলে দেয়, সব সময় হাঁটা চলা এমন হবে, যাতে মনে হয় দু’ কাঁধের ওপর অনেকটা করে ওজন রয়েছে’।

শুধুমাত্র অভিনয় নয়, টেলিভিশনের জন্য পরিচালক হয়েছেন সৌমিত্র। বিশিষ্ট নাট্যব্যক্তিত্ব বিভাস চক্রবর্তী ধরিয়ে দিলেন, ‘মহাসিন্ধুর ওপার হতে’ নামে একটি টেলিফিল্ম পরিচালনা করেছিলেন সৌমিত্র। সেখানে একজন দোকানদারের চরিত্রে অভিনয় করতে দেন আমাকে। বাবা-মেয়ের চরিত্রে সৌমিত্রদা আর পৌলমী ( বসু, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের মেয়ে) অভিনয় করেছিল। ছিলেন নীলিমা দাসও।’ টেলিফিল্ম থেকে মেগাসিরিয়াল বা নন-ফিকশনে ‘না’ ছিল না সৌমিত্রর। বহুবার নিজের ছবির প্রচারে উপস্থিত হয়েছেন রিয়্যালিটি শো-এ। ‘দাদাগিরি’-র মঞ্চে সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেছিলেন, আশি পেরিয়েও সৌমিত্র অত কাজ করেন কী করে! সৌমিত্রর পাল্টা ছিল, ‘সৌরভের কাজের তালিকা দেখলেই স্পষ্ট হবে, সৌরভ মোটেই কম যান না।’ বাংলাতে অনেক অভিনেতা-অভিনেত্রী মনে করেন, টেলিভিশন তুলনায় বেশি পারিশ্রমিক পাওয়ার একটা পথ। তবে টেলিভিশন কাজের আর্কাইভাল মূল্য কম, তাই টেলিভিশন সম্পর্কে একটা উদাসীনতা তাড়া করে অনেককে।

তবে করোনার আবহাওয়াতে সিনেমার শুটিংয়ে ফেরার সময় সৌমিত্রকে প্রশ্ন করাতে তাঁর সাফ কথা ছিল, ‘বাড়িতে বসে থাকলে ভাত-ডাল জুটবে না। শুধু সিনেমা নয়। বিজ্ঞাপন হোক বা টেলিভিশন, আমাকে পাওয়া যাবে নিয়মিত। যতদিন এই শরীর রয়েছে…’ বক্স ‘মাণিকদা বললেন, গোয়েন্দার আবার বয়স হয় নাকি?’ রায় পরিবার ফেলুদার ব্যাপারে বরাবর অতিসতর্ক। বহু পরিচালক ফেলুদা সৃষ্টির অনুমতি চাইলেও, বেশিরভাগ সময় শূন্য হাতে ফিরতে হয়েছে তাঁদের। ব্যতিক্রম বিভাস চক্রবর্তী। যাঁকে টেলিভিশনে ফেলুদা তৈরির জন্য অনুমতি দিয়েছিলেন স্বয়ং সত্যজিৎ রায়। বিভাসের কথায়, ‘দূরদর্শনে চাকরি করতাম। কিন্তু বিবাদের জেরে সে চাকরি ছাড়তে হয়। তখন মনে হল, বাইরে থেকে দূরদর্শনের জন্য কোনও প্রোজেক্ট করা যায় কি না। ওরা আগ্রহ দেখাল, গোয়েন্দা গল্পে। তখন মানিকদার কাছে যাই। উনি বলে দেন, এমন গল্প বাছতে, যেখানে জটায়ু নেই। বলেন, ‘জটায়ু করার লোক নেই’। বিভাসের কথায়, ‘ঘুরঘুটিয়ার ঘটনা’ গল্পটা বাছি। ফেলুদা কাকে নিচ্ছি, জানতে চাইলে, বলি, সৌমিত্রর কথা ভেবেছি। কিন্তু উনি বলছেন, বয়স হয়ে যাওয়ার কারণে করা ঠিক হবে না। মানিকদা তখন বলেন, ‘গোয়েন্দার আবার বয়স হয় নাকি? সৌমিত্রকে বলো করতে। পরচুলাটা অনন্তর কাছে আছে (মেকআপ আর্টিস্ট অন্তত দাস)।’ তখন সৌমিত্রদা রাজি হন। সে সময় ব্যোমকেশ আর কিরীটী করার অনুমতি পাইনি। তখন আবার মানিকদার কাছে যাই। উনি অসুস্থ। ক’ দিন পরেই নার্সিংহোমে চলে যাবেন। সে সময় আমাকে ‘গোলকধাম রহস্য’ করার অনুমতিও দেন। এই দু’ টো গল্প টেলিভিশনের জন্য তৈরি করেছিলাম’।

প্রসঙ্গত সত্যজিৎ রায়, সন্দীপ রায় ছাড়া শুধুমাত্র বিভাস চক্রবর্তীকেই দু’টি ফেলুদার গল্প পরিচালনা করার অনুমতি দিয়েছিলেন। টেলিভিশনের সেই ফেলুদা সাংঘাতিক জনপ্রিয় হয়েছিল।

এই সময় ডিজিটাল এখন টেলিগ্রামেও। সাবস্ক্রাইব করুন, থাকুন সবসময় আপডেটেড। জাস্ট এখানে ক্লিক করুন



Continue Reading

You might also like

Leave A Reply

Your email address will not be published.