|

নজরুলের সব স্মৃতিচিহ্ন এখনও অবহেলিত

 

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের স্মৃতিজড়িত স্থানগুলো অবহেলার শিকার। সংরক্ষণের অভাবে বদলে যাচ্ছে অনেক স্থান; হারিয়ে যাচ্ছে কবির স্মৃতি।

অন্যান্য দেশে জাতীয় কবির স্মৃতিধন্য সব স্থান সংরক্ষণের আওতায় নেওয়া হলেও এ দেশে এখনো তা হয়নি। ঢাকা, ময়মনসিংহ, কুমিল্লা ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্থানে আছে নজরুলের অনেক স্মৃতি। কোথাও বসে তিনি কালজয়ী গান, কোথাও বসে লিখেছেন বিখ্যাত কবিতা। কোথাও কোথাও আছে কবির প্রাতিষ্ঠানিক, ব্যক্তিগত ও পারিবারিক স্মৃতি। যা বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের বিশেষ অংশ বলে মনে করেন গবেষকরা।

কবির মৃত্যুর ৪২ বছর পরও এগুলো সংরক্ষণে সরকারি উদ্যোগ না থাকায় ক্ষোভ রয়েছে নজরুল গবেষক ও অনুরাগীদের। দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কবির স্মৃতিবিজড়িত স্থান ও স্থাপনাগুলো দেখার সুযোগ করে দিতে নজরুল ইনস্টিটিউটের সহযোগিতায় পর্যটন করপোরেশন ‘নজরুল পর্যটন’ চালুর উদ্যোগ নেয়। রহস্যজনক কারণে এ উদ্যোগও বেশিদূর এগোয়নি। এ কার্যক্রম বাস্তবায়িত হলে পর্যটকরা জাতীয় কবি সম্পর্কে আরো তথ্য জানতে পারতেন।

মুক্তিযুদ্ধের পর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অসুস্থ কবিকে পশ্চিমবঙ্গ থেকে ঢাকায় নিয়ে আসেন। বঙ্গবন্ধুর সরকার কবিকে নাগরিকত্ব ও সপরিবারে ধানমণ্ডির ২৮ নম্বর সড়কের ৩৩০ নম্বর বাড়িতে থাকতে দেয়। ১৯৭২ সালের ২৪ মে থেকে ১৯৭৫ সালের ২২ জুলাই পর্যন্ত কবি ওই বাড়িতে ছিলেন। পরবর্তী সময়ে বাড়িটিতে নজরুল ইনস্টিটিউট গড়ে তোলা হয়েছে। তবে বাড়ির সামনের যে বাগানে কবি হাঁটতেন, তা পরিণত হয়েছে গ্যারেজে। সেখানে কবির কোনো স্মৃতিচিহ্ন বর্তমান নেই।

নজরুল ইনস্টিটিউটের এক হিসাব মতে, ঢাকায় কবির স্মৃতিজড়িত স্থান আছে ৩১টি। স্থানগুলো সংরক্ষণ ও নামফলক বসাতে ২০০৬ সালে ওই সময়ের অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনের (ডিসিসি) কাছে আবেদন করে নজরুল ইনস্টিটিউট। ডিসিসি ওই আবেদনে সাড়া দেয়নি। স্থানগুলো সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি আজো।

চলচ্চিত্র গবেষক অনুপম হায়াতের ‘দোলন-চাঁপার হিন্দোল’ বই থেকে জানা যায়, পশ্চিমবঙ্গ থেকে বেড়াতে এলে নজরুল পুরান ঢাকার বেচারাম দেউড়ির একটি বাড়িতে থাকতেন। বাড়িটি এখন গুদামঘর। ঢাকার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) দোতলার ১১৭ নম্বর কক্ষে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত নজরুল চিকিৎসাধীন ছিলেন। কক্ষটিকে সংরক্ষণের আওতায় আনা হয়নি। বাংলা একাডেমি ও এফডিসিতে নজরুলের দুটি আবক্ষ মূর্তি আছে। সেগুলো যথারীতি অযত্নের শিকার।

নজরুলের স্মৃতিজড়িত ময়মনসিংহের ত্রিশালের দরিরামপুর উচ্চ বিদ্যালয়কে সরকারিকরণের ঘোষণা এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। ১৯৯০ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি এইচএম এরশাদ, ১৯৯১ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ও ১৯৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের এক উপদেষ্টা বিদ্যালয়টিকে সরকারিকরণের ঘোষণা দেন।

গবেষকদের মতে, নজরুল এ বিদ্যালয়ে দুই বছর পড়াশোনা করেন। ১৯৬৪ সালে প্রতিষ্ঠানটি নাম বদলে হয় ‘নজরুল একাডেমি’। তবে বিদ্যালয়টির যে দুটি শ্রেণিকক্ষে বসে নজরুল পাঠ নিতেন, সেগুলো সংরক্ষিত আছে। ত্রিশালের কাজীর শিমলায় ২০০৮ সালে নজরুল ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে নির্মিত হয় ‘নজরুল স্মৃতিকেন্দ্র’।

ওই স্মৃতিকেন্দ্রেও নেই কবির উল্লেখযোগ্য কোনো স্মৃতি। ছড়িয়ে থাকা স্মৃতিগুলো সংগ্রহেরও উদ্যোগ নেই। স্মৃতিকেন্দ্রে তাই শোভা পাচ্ছে শুধু কবির ব্যবহৃত একটি খাট ও কিছু ছবি। ত্রিশালের নামাপাড়ায় কবির স্মৃতিজড়িত বটতলায় ২০০৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় তার নামে বিশ্ববিদ্যালয়।

গবেষকদের মতে, নজরুলের স্মৃতিধন্য স্থান কুমিল্লার মুরাদনগরের দৌলতপুর। যা ‘কবিতীর্থ’ নামে পরিচিত। নজরুল ও তার স্ত্রী নার্গিসের স্মৃতিজড়িত এ স্থানও যথাযথভাবে সংরক্ষণের উদ্যোগ নেই। ১৯২১ থেকে ১৯২৪ সাল পর্যন্ত কবি পাঁচবার কুমিল্লায় আসেন। সব মিলিয়ে তিনি ১১ মাসের বেশি সময় কাটান। কবি সেখানে বসে ১৬০টি গান ও ১২০টি কবিতা লেখেন। কবির বিয়ে থেকে শুরু করে দুই দফায় গ্রেপ্তারও হন এ জেলায়।

প্রমীলা দেবীর বাড়ি, ধর্মসাগর, ঝাউতলা, বসন্ত স্মৃতি পাঠাগার, নানুয়া দীঘির পাড়, দারোগা বাড়ি, বীরচন্দ্র নগর ও শচীন দেব বর্মনের বাড়িসহ অনেক এলাকা তার স্মৃতিজড়িত। প্রমীলার নানাবাড়ি মানিকগঞ্জের শিবালয়েও দুইবার গিয়েছিলেন নজরুল। যমুনার পাড়ে তেওতাঁ জমিদার বাড়িতে বসে কবিতাও লেখেন তিনি।

গবেষণাপত্র পর্যালোচনা করে জানা যায়, চট্টগ্রামে নজরুল যান তিনবার। ১৯২৬, ১৯২৯ ও ১৯৩৩ সালে তিনি কমপক্ষে ৪৭ দিন (ভিন্নমতও আছে) সেখানে অবস্থান করেন। তার বিভিন্ন লেখাতেও চট্টগ্রাম সফরের কথা উলে­খ আছে। তবে সেখানে কোথাও কবির স্মৃতিজড়িত স্থান সংরক্ষিত নেই।

You might also like

Leave A Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.