‘বাবাকে ওঁদের মনে রাখতেই হবে, কোথাও লেখা নেই’


এক সময় নায়িকা হিসেবে টলিউডে দারুণ জনপ্রিয় হয়েছিলেন চুমকি চৌধুরী। এখন ইন্ডাস্ট্রির কেউ খোঁজ রাখে না তাঁর। যে সব পরিচালক-অভিনেতাকে নতুন জীবন দেন তাঁর বাবা অঞ্জন চৌধুরী, তাঁরা কি সঠিক প্রতিদান দিয়েছেন? অপকট চুমকির সামনে দেবলীনা ঘোষ

‘আমার কোনও অভিমান নেই বাংলা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির উপর। নিশ্চয়ই তাঁরা আমাকে যোগ্য মনে করেন না। তাই কাজ দেন না। তবে কাজ পেলে খুব যত্ন করে করতাম। কিন্তু সেটার বোধহয় দরকারও পড়ে না খুব’, বেশ হাসতে হাসতেই বলে দিলেন চুমকি। তাঁকে শেষ বড়পর্দায় দেখা গিয়েছিল শ্যামল দাসের পরিচালনায় ‘স্নেহের বন্ধন’ ছবিতে। ২০১৩ সালে। সাত বছর কোনও কাজ নেই কেন? চুমকির ব্যাখ্যা, ইন্ডাস্ট্রিতে বহু বছর থাকলেও খুব হাতে গোনা মানুষকেই তিনি চেনেন। বেশিরভাগের সঙ্গেই আলাপ নেই। তাই কাজের কথা তিনিও কাউকে বলেন না। তেমন কোনও প্রস্তাবও আসে না। ‘আসলে আমরা চিরকাল বাবার সঙ্গে কাজ করেছি। তাই ইন্ডাস্ট্রির কাউকে চেনার তেমন দরকার পড়েনি। এখনও তাই গিয়ে আলাপ জমাতে পারি না’, অকপট চুমকি।

চুমকি চৌধুরী নামটা শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে ‘হীরক জয়ন্তী’, ‘পূজা’, ‘রাখিপূর্ণিমা’, ‘লোফার’, ‘বড় বউ’, ‘মুখ্যমন্ত্রী’, ‘নাচ নাগিনী নাচ রে’, ‘সেজ বউ’, ‘মহাজন’, ‘আব্বাজান’ এর মতো গুচ্ছ সুপারহিট বাংলা ছবির পোস্টার।

এক সময় অঞ্জন চৌধুরী মানেই সুপারহিট। তিনি অনেক অভিনেতা-পরিচালককে হাতে ধরে তৈরি করেছেন। বাংলা ছবির পালে আনে জোয়ার। তাঁরা এখন খোঁজ রাখেন? এ বারও বেশ হাসি মুখেই জবাব দিলেন নায়িকা। ‘আমার বাবা নিজের টাকা খরচ করে অনেকের কেরিয়ার গড়ে দিয়েছিলেন। হাতে ধরে কাজ শিখিয়েছিলেন। তাঁদের বাবাকে মনে রাখতেই হবে এ রকম তো কোথাও লেখা নেই। বাবা কেন করেছিলেন? কেউ কী বলেছিল? এ রকম মানুষের এটাই প্রাপ্য। আমরা এ ভাবেই বিষয়টা দেখি’, সাফ উত্তর তাঁর। যেমন অনেক সিনেমায় তাঁর সংলাপে থাকত।

এখনকার বাংলা ছবি তেমন দেখেন না। কারণ কথায় কথায় বিদেশে গানের শুটিং আর অযথা মারপিট তাঁর পছন্দ নয়। তবে তিনি কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়ের ভক্ত। পছন্দ সৃজিত মুখোপাধ্যায়, শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় আর নন্দিতা রায়ের ছবি। ‘আমি ‘গুমনামী’ দেখার পর বুম্বাদাকে ফোন করে বলেছিলাম যেন মনে হচ্ছে নেতাজীকেই দেখছি। কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়ের অভিনয়-পরিচালনা দুই ভালো লাগে। এঁদের ছবি আমি হলে গিয়ে দেখি। তবে নতুনদের অভিনয় ঠিক বুঝি না। ওঁরা আমার থেকে এত ছোট যে এ বিষয়ে কিছু বলতে চাই না’, বলছিলেন চুমকি। কোনও উপদেশ দিতে চান কি এই প্রজন্মের অভিনেতাদের? প্রশ্ন করার সঙ্গে সঙ্গেই থামিয়ে দিয়ে বললেন, ‘আমি উপদেশ দেব ওঁদের? বরং ওঁরাই অনেক কিছু শেখাতে পারে আমাকে। তবে একটা কথা বলতে চাই, ভালো সিনেমা কিন্তু এখনও মানুষ দেখেন হলে গিয়ে। দর্শক কিন্তু ঠিক বোঝেন, কোনটা ভালো কোনটা খারাপ।

করোনার পর যখন থেকে কাজ শুরু হয় দুটো সিরিয়াল করার প্রস্তাব পান। কিন্তু করেননি। কারণ পারিশ্রমিক। ‘ওঁরা এমন পারিশ্রমিক দিচ্ছিলেন যে তাতে কাজ করা সম্ভব নয়। সিরিয়ালে সময় বেশি দিতে হয়। ওই টাকায় কাজ করার থেকে বাড়িতে থাকা ভালো। আমি তো পুরো লকডাউন বাড়িতেই থেকেছি। আমার মায়ের শরীর খারাপ। ম্যাসিভ স্ট্রোক হয়েছিল। ওঁকে আমরা তিন ভাইবোন পালাপালি করে দেখি। সবাই কাছাকাছি থাকি। আমি নিউ আলিপুরে, মা বেহালায় আর বোন ঠাকুরপুকুরে। আমার স্বামীও অসুস্থ। ওঁকেও দেখতে হয়’, মন্তব্য চুমকির।

প্রতি বছর এখনও প্রচুর অনুষ্ঠান করেন। কারণ গ্রামের মানুষ এখনও ভীষণ ভালোবাসা দেন। সঙ্গে থাকে বিভিন্ন পুজোয় ফিতে কাটা। কিন্তু এ বছরটা অন্য রকম। ফাংশন তেমন হওয়ার আশা দেখেছেন না তিনি। বোন রিনা চৌধুরী আর ভাই সন্দীপ চৌধুরী চলে গিয়েছেন ক্যামেরার পিছনে। রিনার পরিচালনায় সাহেব চট্টোপাধ্যায় আর বিদিশা চৌধুরীর সঙ্গে ‘কল্পতরু’ ছবিতে অভিনয় করেছেন তিনি। আরও একটি ছবির কাজ চলছে। বিদিশা, চুমকির ভাই সন্দীপের স্ত্রী। চুমকির কথায়, ‘বাবার পরিচালনা বা ক্যামেরার পিছনের কাজটা আমার দুই ভাইবোন ধরে রেখেছেন। আমি অভিনয় করি। ভাই অনেক বছর সিরিয়ালে কাজ করছেন। রিনাও পরিচালনা করছেন। আমি আসলে খুব ঘরকুনো। বেশিক্ষণ বাইরে থাকতে ভালো লাগে না। তাই খুব অল্পেই সন্তুষ্ট থাকি।’

দুটো সিরিয়ালের প্রস্তাব ফিরিয়ে দেওয়ার পর আর কোনও কাজের প্রস্তাব আসেনি। তবে লীনা গঙ্গোপাধ্যায়ের সিরিয়ালে অভিনয় করতে চান। মা, ভাই, বোন, তিনি নিজে-গোটা পরিবার একে অপরকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে রয়েছেন। আড্ডা দিয়ে, হেসে, মজা করেই সময় কেটে যায়। ফলে বাইরের কোনও বন্ধুর প্রয়োজন পড়ে না আর। বক্তব্য চুমকির। সঙ্গে রয়েছে তাঁর পশুপ্রেম। একটি সংস্থার সঙ্গে কিছু কাজও করেন তিনি। এই নিয়েই জীবন কাটছে।

আর বড় পর্দা? ‘এখন টেকনোলজি অনেক এগিয়ে গিয়েছে। তবে কয়েকজন ছাড়া আর কাউকেও কিন্তু খুঁজে পাওয়া যায় না অভিনয়ের দিক দিয়ে’, দ্বিধাহীন মন্তব্য তাঁর। আর নিজের অভিনয়? ‘খারাপ ছবিতে কাজ করার থেকে বাড়ি বসে গল্প করা, সিরিয়াল দেখা অনেক ভালো’, সাফ জবাব নায়িকার।



Continue Reading

You might also like

Leave A Reply

Your email address will not be published.