|

বেকার মুক্ত বাংলাদেশ গড়তে ফ্রিল্যান্সিং পেশাই যথেষ্ঠ। ফ্রিল্যান্সার নাসিম।

দিনাজপুরের নাসিম, নবম শ্রেণীতে পড়ার সময় জানতে পারেন অনলাইনেও টাকা উপার্জন করা যায়, সে থেকেই অনলাইনে বিভিন্ন কাজ নিয়ে ব্যস্ততা।
২০১৫ সালে ফ্রীলান্সার ডট কমে, ২৭ মিলিয়ন ফ্রীলান্সারের মধ্যে সেরা ১০ এ স্থান করে নেয় ওয়েব প্রোগ্রামার হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করা নাসিম। এবারে আমাদের আনন্দ ভূবন ম্যাগাজিনের মুখোমুখি হয়েছেন ফ্রীলান্সার নাসিম। জানালেন ফ্রীলান্সিং ক্যারিয়ারের জানা অজানা অনেক কথা, এবং দিয়েছেন নতুনদের উদ্দেশ্যে কিছু পরামর্শ।

(এই এক্সক্লুসিভ ইন্টারভিউটি নিয়েছেন সাজিয়া ইসলাম মিম)


শুরুতেই আমরা জানতে চাইলাম কেমন আছেন ?

উত্তরে তিনি বলেন – আলহামদুলিল্লাহ বর্তমানে যেভাবে আছি অনেক ভালোই আছি। কারন আমি ৩ বেলা ডাল ভাত খেতে পারি। এটাই সব থেকে বড় পাওয়া। হাজারও মানুষ ১ বেলা খেয়ে দিন কাটিয়ে দেয়। যেখানে আমি ৩ বেলা খাই। হাজারও মানুষ আমার মত ভালো থাকতে চায়। আমিও হাজারও মানুষের অনুপ্রেরণা। তারা আমার মত করে ৩ বেলা খেয়ে ২ টা মোটা কাপর পরে চলতে চায়। সেখান থেকে বিবেচনা করে আল্লাহর কাছে এতটুকুই শুকরিয়া করে বললাম অনেক ভালো আছি।


বর্তমানে ব্যস্ততা কি নিয়ে ?

তিনি বলেন : বর্তমানে ব্যস্ততা অনেক কিছু নিয়েই। কোথার থেকে শুরু করব জানিনা, প্রথমত মাথার উপরে বাবার সাপোর্ট টা ২০১৬ তে হারিয়েছি, উনি আজ নেই। তাই তার দেয়া দায়িত্বটা অর্থাৎ মা আর ছোট্ট ভাই নওশাদ (১৫) কে হাশিখুশি রাখা নিয়ে যত কাজের ব্যস্ততা। পাশাপাশি লেখাপড়া করছি অনার্স ২য় বর্ষ, ইংরেজি বিভাগে। আর ফ্যামিলির বড় হিসেবে পেশায় নিয়জিত রয়েছি “ফ্রিল্যান্সার হিসেবে”। অন্যদিকে একজন ইউটিউবার, ১ লাখ সাবস্ক্রাইবারের ভালোবাসা পেয়েছি ইতিমধ্যে ফ্রিল্যান্সিং বিষয়োক দিক নির্দেশনা দিয়ে।
তার ইউটিউব চ্যানেল দেখতে এই লেখার ওপর ক্লিক করুন।


কিভাবে এই ফ্রিল্যান্সিং এর জগতে আসলেন একটু বিস্তারিত বলুন।

নাসিম বলেন : ২০১২ সাল থেকেই ফ্রিল্যান্সিং করি যখন আমি নিবম শ্রেনি তে থাকি, সেই থেকে আজ পর্যন্ত এতদুর। পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক উন্নয়ন ও বেকারত্ব দূর এর জন্য উদ্যোক্তা হিসেবে কাজ করি। যেখানে নেই আমার কোনো কমার্শিয়াল ডিমান্ড। নিজের কাজের পাশাপাশি দেশের জন্য একটু অবদান রাখতে কার না ভালোলাগে।
এবার আসি কিভাবে এই ফ্রিল্যান্সিং এর যগতে আসলাম। ফ্রিল্যান্সার হওয়ার ইচ্ছে ছিলনা, জানতাম না ফ্রিল্যান্সিং কি। বাবা বাংলাদেশ আর্মির একজন সার্জেন্ট ও মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন ছিলেন। ১৯৮৫ সালে তিনি অবসরপ্রাপ্ত হন। বাবার স্বপ্ন ছেলেকে তার মত করে আর্মি হিসেবে গড়ে তুলবে। ও হ্যা বলতে ভুলে গিয়েছি আমি দিনাজপুর জেলার বিরল উপজেলার রবিপুর নামক একটা ছোট্ট ধুলোবালি মাখা গ্রামের ছেলে। তাই বাবা ভাবতেন ছেলে আর্মি হবে, রাস্তা দিয়ে হেটে গেলে বলবে আর্মির ছেলে আর্মি যাচ্ছে। বাবা ত বাবাই। তাইনা ? স্বপ্ন দেখতে কার না ভালো লাগে ? আমিও সেভাবে আগাচ্ছিলাম কিন্তু, এই পছন্দের ব্যতিক্রম ঘটে অল্প কিছুদিনের ভিতরেই। যখন আমি একটা কম্পিউটার প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে ভর্তি হলাম তখন। প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের মালিক ফ্রিল্যান্সিং করতেন। ডিজিটাল মার্কেটার হিসেবে। আমি তার কাছেই শুনেছিলাম অনলাইন থেকে ইনকাম করা যায়। প্রথমত গুগলে ঘাটা ঘাটি করে অনেক আইডিয়া পেলাম। ভালো লাগার কাজ টি বেছে নিলাম। তারপরে শুধু মাত্র পকেট খরচ মিটানোর জন্য এই কাজের ইচ্ছে হয়েছিল। এভাবেই চলতে থাকে,,,,

নবম শ্রেনি শেষ দশম শ্রেনিতে উঠতেই ওয়েব ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট এর অনেক কিছুই শিখে গিয়েছিলাম। তখন সেই কম্পিউটার প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের ভাইয়ার আন্ডারে কাজ করতাম, যেহেতু আমার কম্পিউটার ছিলনা। এর পরে ২০১২ সালে মেট্রিক পাশ করে বাবা ল্যাপটপ কিনে দেন, ঠিক তখনই কাজ শুরু করি নিজের মত করে। সেই থেকে সব কিছু নিজে থেকে শেখা, আমার আজকের পজিশন অনুযায়ী এতটুকু সত্য বলতে চাই আমার কোনো মেন্টর ছিলনা। সব কিছু নিজের মেধায় অর্জন করা। এভাবে চলতেই থাকলো,,,


সর্ব প্রথম কত ডলারের কাজ পেয়েছিলেন ?

তিনি জানান : ফ্রিল্যান্সার হিসেবে আমার প্রথম যে প্রজেক্ট হয় এক আমেরিকান বায়ার এর সাথে। মাত্র ৩ ডলারের, তাতেই আমি খুশি ছিলাম। তারপর একের পর এক এক করে প্রজেক্ট পাওয়া আর কমপ্লিট করা। এদিকে ইন্টারমেডিয়েট লেখাপড়া করা। এভাবেই চলতে চলতে জানিনা কবে যে এই পেশার প্রেমে পরে গিয়েছি তখন আর আর্মি হওয়ার চিন্তা মাথায় ছিলনা। বাবাও আমার সুনাম ও সাকসেস দেখে কখনও বলেনি আর্মি হওয়ার কথা। কিন্তু প্রথম দিকে ফ্যামিলির থেকে কেউ সাপোর্ট করেনি। কারন গ্রামের মানুষ এসব কিছু বিশ্বাস করেনা এটাই স্বাভাবিক। তারা তাদের দুনিয়াকে ঠিক সেই ১৯ শতকের মত করেই ভাবে, তারা পরিস্থিতির শিকার।

এত এত পেশা থাকতে কেন ফ্রিল্যান্সিং কেই পেশা হিসেবে বেছে নিলেন ?
জবাবে তিনি বলেন : আমার মতে Passion কে Follow করা প্রয়োজন। যার কারনে যেটাতে ভালো লাগা সেটাকেই পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছি। আর সব থেকে বড় কথা হল এই পেশায় আমি একজন স্বাধীন মানুষ। আমাকে কারও প্রেসারে থাকতে হয় না, আমার অফিসে আমিই বস।


একজন প্রোগ্রামার হতে গেলে শুরু তে কি কি শিখা উচিত বলে আপনি মনে করেন ?

নাসিম বলেন : একজন প্রোগ্রামার হতে গেলে আগে অবশ্যই ইংরেজি তে দক্ষতা অর্জন করতে হবে। তারপরেই বিভিন্ন ওয়েবসাইট, সফটওয়্যার ব্যবহার এর দক্ষতা চাই। যখন আমরা কোনো মটর বাইক চালাতে পারি তখন অতি সহজেই বুঝি যে সেটি কি কি জিনিশ দিয়ে তৈরি। ঠিক তেমনি একটা সফটওয়্যার ব্যবহার করতে জানলে, কিভাবে সেটি তৈরি করতে হয় তা শিখতে সুবিধা হবে। প্রোগ্রামার হতে গেলে আগে ভালো কিছু প্রোগ্রামিং লেংগুয়েজ এর প্রতি ধারণা অর্জন করতে হবে। এক্ষেত্রে কেউ যদি এন্ড্রয়েড এপ্স ডেভেলপার হতে চায় তার জন্য “জাভা” শিখতে হবে আগে। স্কুল কলেজের ছাত্রছাত্রী রা “সি” দিয়ে শুরু করতে পারে আইডিয়ার জন্য। তারপরেই তাকে বেছে নিতে হবে সে কিসের প্রোগ্রামার হতে চায়। যদি ওয়েব প্রোগ্রামার হয় তবে PHP, যদি ডেস্কটপ এপ্স তৈরি করতে চায় তবে JAVA+C++ C# python ইত্যাদি।


আপনার অনুপ্রেরণা কে?

তিনি বলেন : আমার অনুপ্রেরণা জনপ্রিয় “”মার্ক জাকারবার্গ”” ফেইসবুক নির্মাতা। Jan Koum, Whatsapp নির্মাতা, Kevin Systrom, Instagram নির্মাতা। কারন মার্ক এর কথা চিন্তা করলেই দেখা যায় তিনি মাত্র ৩০ বছর বয়সে বিলিয়নার হয়েছেন। আর আমরা ৩০ বছর বয়সে বিভিন্ন কম্পানির দর্জায় দুইটা পয়সা ইনকামের জন্য চাকরি চেয়ে জুতা খয় করি, যা আমি পছন্দ করিনা। আমাদের বাংলাদেশে মনে হয়না এভাবে কেউ স্বপ্ন দেখতে চায়। দেশের অবস্থা অনুযায়ী এরকম স্বপ্ন কল্পনাও করা যায়না। কিন্তু আমি একটু “”Out of the box”” চিন্তা করি। তাই তাকেই অনুপ্রেরণা হিসেবে নিয়েছি। তার মত করে ১% ও যদি অর্জন করতে পারি তাতেই আমি সন্তুষ্ট।


আগামী পাঁচ বছরে নিজেকে কোথায় দেখতে চান?

নাসিম বলেন : আগামী ৫ বছরে নিজেকে বাংলাদেশ নয় সারা বিশ্বের পরিচিত একজন ভালো Entrepreneur হিসেবে দেখতে চাই। বাংলাদেশের বেকারত্ব দূর করার জন্য ফ্রিল্যান্সিং পেশাই যথেষ্ঠ বলে লিডারশীপ করতে চাই।


যেহেতু আপনি একজন সফল প্রফেশনাল ফ্রীলান্সার, তো নতুন যারা এই পেশাতে আসতে চায় তাদের উদ্দেশে কি পরামর্শ দিবেন?

তিনি বলেন : যারা নতুন এই পেশায় আসতে চান তাদের ব্যাপারে বলবো, নতুনদের নিজেকে এমন ভাবে গড়ে তুলতে হবে যেনো ১০ টা দেশ থেকে ১০ জন কে সামনে দাড় করিয়ে দিলে সে আর বাকি ১০ জনের মধ্যে অন্তত ইংরেজি তে কমিউনিকেশন করতে কোনো ভেদাভেদ না দেখা যায়। তারপরেই তাকে পছন্দের স্কিল টি ডেভেলপ করে নিতে হবে। আমি রিকমেন্ড করব “”ওয়েব প্রোগ্রামিং”” তাই কাজ ভালো মত শিখে তবেই কাজে নামতে হবে। নয়তো সমস্যায় পড়তে হবে কাজ করতে গিয়ে। শুধু ফেইসবুক আর ইউটিউব মানেই ডিজিটাল নয়। নিজেকে Box এর বাইরে চিন্তা করতে হবে। নিজের ডিভাইসের সমস্যা নিজেই গুগল করে সলিউশন বের করে করতে হবে। এসব ব্যাপারে মাল্টি টেলেন্টেড হলেই একজন ব্যক্তি খুব সহজে ফ্রিল্যান্সিং পেশায় আসতে পারবেন।


বিশ্বের ৩৬ টি দেশ থেকে আমাদের সাইটে ভিজিটর আসে, সো আমাদের আনন্দ ভূবন ম্যাগাজিনের পাঠকদের উদ্দেশে কিছু বলুন ?

নাসিম বলেন : আনন্দ ভূবন ম্যাগাজিন সম্পর্কে বলার মত ভাষা আমার নেই। যদি আমি ভুল না বলি তবে হয়ত ওয়েবসাইট তৈরির শুরু টা আমাকে দিয়েই হয়েছিলো, যার জন্য নিজেকে গর্বিত ভাবি। বর্তমানে আনন্দ ভূবনের নাম বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পরেছে। ভবিষ্যৎ এ এটি বাংলাদেশে আরও বেশি সুনাম অর্জন করবে বলে আশা রাখছি।
সব কিছুর মঙ্গল কামনা করে শেষ করলাম।
ধন্যবাদ।

আপনাকেও ধন্যবাদ ভালো থাকবেন।

You might also like

Leave A Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.