বেলা শেষ হল, সংসার ছেড়ে হোমাপাখি হয়ে উড়ে গেলেন অপু…


হাইলাইটস

  • ফাইট করেছিলেন, কিন্তু পারলেন না ‘ক্ষিদ্দা’।
  • ফিরতে চেয়েছিলেন সংসারে, কিন্তু পারলেন না ‘অপু’।
  • ‘আবার অরণ্যে’ যাওয়ার কথা ছিল তাঁর, কিন্তু ‘বেলাশেষে’ সে ইচ্ছাও পূরণ হল না।

সুমন বিশ্বাস

‘বসন্ত নয়, আমার দরজায় প্রথম কড়া নেড়েছিল অবহেলা…’ আর রবিবারের এক ফ্যাকাশে দুপুরে সেই মানুষটার দরজায় এসে কড়া নাড়ল মৃত্যু! ‘আমি অবহেলাকে পেছনে ফেলে একবার ভোঁ-দৌড় দিয়ে এগিয়ে গিয়েছিলাম…’ তারপর আলোর উৎসবের মাঝেই বাঙালির বুকে গাঢ় অন্ধকারের আবরণ তৈরি করে সেই মানুষটাই দৌড়ে পৌঁছে গেলেন ঠিক সেখানে, যেখানে ‘ফুল, পাখি, নদীর কাব্যালাপে কারা মশগুল হল, এ নিয়ে কৌতুহল দেখাবার দুঃসাহস আমি দেখাইনি কখনও…’ আসলে যাঁর জীবনটাই একটা দুঃসাহসের প্রতিচ্ছবি, তাঁর মুখেই বোধহয় শোভা পায় এই তাচ্ছিল্য, এই অবজ্ঞা, একইসঙ্গে প্রজ্ঞাও। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়- এক স্বপ্নের নাম, শহুরে এলিট থেকে গ্রাম্য সারল্যের এক বন্ধুর নাম, লিয়র নয়-সৌমিত্রই আসলে ‘কিং’, রাজপাট ছেড়ে তাঁর আজ মৃত্যুর রহস্য ভেদ করার দিন।

ফাইট করেছিলেন, কিন্তু পারলেন না ‘ক্ষিদ্দা’। ফিরতে চেয়েছিলেন সংসারে, কিন্তু পারলেন না ‘অপু’। ‘আবার অরণ্যে’ যাওয়ার কথা ছিল তাঁর, কিন্তু ‘বেলাশেষে’ সে ইচ্ছাও পূরণ হল না। আসলে সৌমিত্র মানে শুধু রিল নয়, বাঙালি তাঁকে রিয়েল করেছিল যাপনে-স্বপনে। ‘মহানায়ক’ না হয়েও তিনি তাই বাঙালির সবচেয়ে ‘ফ্যাসিনেটিং টপিক’। তাঁর মৃত্যুতে তাই স্বজনবিয়োগের কষ্ট পাচ্ছে বাঙালি, ভাতের হাঁড়ি চড়াতে চাইছে না বহু গৃহস্থবাড়ি। করোনার করাল গ্রাসকে তুড়ি মেরে সকলেই যেন চাইছে ‘যাই, শেষ দেখে আসি মানুষটাকে’। যে কোটি-কোটি মন আজ কেঁদে উঠছে মানুষটার প্রয়াণে, তাঁদের কাঁধেই তিনি দিয়ে গেলেন একটা বিরাট রাজত্বের দায়ভার, দিয়ে গেলেন জীবনকে সেলিব্রেট করার এক মহামন্ত্র।

চট্টোপাধ্যায় পরিবারের আদি বাড়ি ছিল (অধুনা বাংলাদেশে) শিলাইদহের কাছে কয়া গ্রামে। কিন্তু সৌমিত্রের জন্ম এ বাংলাতেই। কৃষ্ণনগরের সেন্ট জন’স স্কুলের পর হাওড়া জেলা স্কুল। কলকাতার সিটি কলেজ থেকে প্রথমে আইএসসি ও পরে বিএ অনার্স (বাংলা) পাশ করার পর পোস্ট গ্র্যাজুয়েট কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে। জীবনে তখনও অভিনয়ের ছিটেফোঁটা আঁচও এসে পৌঁছয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ই মঞ্চে শিশির ভাদুড়িকে দেখা। ব্যাস, বাংলা চলচ্চিত্র সেদিনই যেন কষ্টিপাথর দিয়ে যাচাই করে নিল আসল ‘সোনা’।

মহাপ্রস্থানের পথে…

সিনেমা জীবনের শুরুর লগ্নে নিজের ব্যারিটোন ভয়েসের জন্যে কাজ হারিয়েছিলেন অমিতাভ বচ্চন। সৌমিত্রের চলচ্চিত্র জীবনের শুরুটাও কিন্তু কম চমকপ্রদ নয়। অল ইন্ডিয়া রেডিওর ঘোষক হিসেবে কাজ শুরু করলেও জীবনের প্রথম স্ক্রিন টেস্টেই ফেল করেছিলেন তিনি। ‘নীলাচলে মহাপ্রভু’ ছবিতে তাই তাঁর জায়গায় বেছে নেওয়া হয় অভিনেতা অসীম কুমারকে। ‘অপরাজিত’তেও বাতিল তিনি! কিন্তু সৌমিত্রের প্রতিভার দ্যূতি যে ঠিক ধরা পড়ে গিয়েছিল সত্যজিতের মনের লেন্সে। ১৯৫৯ সালেই ‘অপুর সংসার’-এ ডাক পড়ল সৌমিত্রের। আর পিছনে ফেরা নেই। সৌমিত্র শুধু এগোলেন। এগিয়ে নিয়ে গেলেন গোটা একটা জাতিকে।

soumitra chatterjee death news

অমলিন হাসিমুখ…

অপু, ফেলুদা, ক্ষিদ্দা, উদয়ন মাস্টার থেকে কিং লিয়র- কী দেননি তিনি বাঙালিকে? আর কতটা দেওয়া যেত? জরিপ করা যায় না তাঁকে। লিজিয়ঁ অব অনার, দাদাসাহেব ফালকে, বঙ্গভূষণ, পদ্মভূষণ এবং জাতীয় স্তরে একাধিক পুরস্কার, বৃত্ত সম্পূর্ণ করতে আর কতটা এগোতে হয়? আসলে তিনি থামার পক্ষপাতীই ছিলেন না। ৮৬ বছর বয়সে এসেও বলতেন, কাজের মধ্যে না থাকলেই ডিপ্রেশন চেপে ধরে। তাই যেভাবে পারেন যতটা পারেন নিজেকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রাখেন কাজের সঙ্গে। একটাই ইচ্ছে, শেষদিন পর্যন্ত যেন যতটা সম্ভব নীরোগে কাজটা চালিয়ে যেতে পারেন। কিছুটা হল, কিছুটা হল না। লকডাউনের পর আবার কাজে ফিরেছিলেন তিনি। কাজ করতে-করতেই করোনায় আক্রান্ত, সেখান থেকেই আর ফেরা হল না তাঁর। দেবতাও তো রক্তমাংসের হয়!

আরও পড়়ুন: শেষ অভিযান, না ফেরার দেশে ফেলুদা

‘আমি জানি, দীর্ঘশ্বাসে ভরা এ আখ্যান যদি পেত কবিতার রূপ/ সেই অবহেলা হত বসন্ত স্বরুপ…’ সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের প্রয়াণের পর সৌমিত্র বলেছিলেন, ‘আর মৃত্যু নিতে পারি না। প্রায় প্রতি মাসেই চেনা একজন-দু’জন করে চলে যাচ্ছেন। আই কানট টেক ইট এনিমোর। ভয় লাগে এখন।’ ভয় শেষ হল শেষমেশ। হোমাপাখি হয়ে কোথায় উড়ে গেলেন মানুষটা…

এই সময় ডিজিটাল এখন টেলিগ্রামেও। সাবস্ক্রাইব করুন, থাকুন সবসময় আপডেটেড। জাস্ট এখানে ক্লিক করুন



Continue Reading

You might also like

Leave A Reply

Your email address will not be published.