‘মগনলালের ঘরে জোর ধাক্কাই মারি ফেলুদাকে’


তোপসে
(সিদ্ধার্থ চট্টোপাধ্যায়)

ভাগ্য ভালো থাকলে প্রথম ছবিতেই সত্যজিৎ রায় এবং সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পাওয়া যায়। আমারও তাই হয়েছিল। কাজের প্রথম দিনেই উনি হয়ে গেলেন আমার সৌমিত্রকাকু। আর ক’দিন পরেই হয়ে গেলেন আমার বাস্তবের ‘ফেলুদা’। বয়সে বছর পঁচিশের বড়। তবু দাদাই হয়ে গেলেন।

প্রথম আলাপের কথা কখনও ভুলব না। লজ্জার মাথা খেয়ে বলেছিলাম, ‘একটা ছবিতে দেখেছি, আপনি খুব ভালো টুইস্ট নাচতে পারেন।’ শুনে বলেছিলেন, ‘এত রকমের ছবিতে কাজ করেছি, শেষে ওই টুইস্টের কথাটাই মনে পড়ল!’ আমি বললাম, ‘আপনাকে ‘কে তুমি নন্দিনী’র তালে দারুণ টুইস্ট করতে দেখার পর, সেটা কি ভোলা যায়?’ উত্তর দিয়েছিলেন, ‘দেখেছ, ভালো করেছ। নিজে ও সব টুইস্ট-ফুইস্ট করতে যেও না যেন।’ এই ছিলেন উনি। কখনও দাদা কাম বন্ধু। আবার কখনও অভিভাবক।

‘সোনার কেল্লা’ ছবিতে দর্শক গল্পের তোপসেকে দেখেননি। দেখেছেন প্রকৃত সিদ্ধার্থ চট্টোপাধ্যায়কেই। আমি যেমন ভাবে কথা বলতাম, যেমন ভাবে হাসতাম, যেমন ভাবে ছুটে যেতাম, পর্দাতেও তাই-ই করেছি। এই সাবলীলতা দেখানোর অনেকটাই সৌমিত্রকাকুর কারণে। কোনও আড়ষ্টতা ছিল না। ‘জয়বাবা ফেলুনাথ’ ছবির মগনলালের ঘরের দৃশ্যে ওঁকে আচমকা ধাক্কা মেরে ফেলে দেওয়ার কথা ছিল। ক্যামেরা রোল করার আগে বললাম, ‘আমি জোরে ধাক্কা দেবো না। আলতো করে দেবো। না হলে যদি চোট লাগে!’ শুনে কাকু বলেছিলেন, ‘তোকে যা করতে বলা হয়েছে, করে যা। বাকিটা আমি সামলে নেব। এখনও ফিট আছি।’ পর্দায় সাবলীল হতে আমারও আর অসুবিধা হয়নি। প্রথম ছবি থেকেই আমাদের দু’জনের অনস্ক্রিন কেমিস্ট্রি দেখে অনেকেই ওঁকে প্রশ্ন করতেন, আমি ওঁর ছেলে কিনা? তার উপর দু’জনের পদবি চট্টোপাধ্যায়।

একবার জিজ্ঞেস করেছিলাম, ফেলুদার চরিত্র করার সময় কী ভেবেছিলেন? উত্তরে বলেছিলেন, ‘ফেলুদা গায়গতরে মারামারি করে না। মগজাস্ত্র দিয়ে কাজ সারে। তাই দৃষ্টিটা তীক্ষ্ণ করার চেষ্টা করেছি।’ ওঁর সঙ্গে কাজ করার সময় কখনও মনে হত না, উনি দূরগ্রহের মানুষ। বরং অত বড় শিল্পী হয়ে উঠতেন কাছের একটা লোক। দিল্লিতে মাণিকজ্যেঠু যে হোটেলে থাকতেন, সৌমিত্রকাকুরও সেখানেই থাকার ব্যবস্থা হয়েছিল। উনি থাকেননি। থাকতেন ইউনিটের বাকিদের সঙ্গে অন্য হোটেলে। এটাই বড় অভিনেতা হওয়ার চাবিকাঠি। ‘সোনার কেল্লা’, ‘অভিযান’ কিংবা ‘হীরক রাজার দেশে’- অভিনয়ের বিরাট ব্যপ্তির মধ্যে দাঁড়িয়েছিলেন মানুষটা। তার বর্ণনা করা সত্যিই খুব কঠিন।

কেন তিনি বাকিদের থেকে একদম আলাদা? নাহারগড়ে শুটিং চলছে। সেই দৃশ্যে সৌমিত্রকাকুর অভিনয় নেই। এদিকে শুটিং দেখতে স্থানীয় লোকেরা হুমড়ি খেয়ে পড়েছেন। ভিড় সামলানোই দায়! শেষ পর্যন্ত দড়ি ধরে ভিড় সামলাতে এলেন সুপারস্টার সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। এমন দৃশ্য বাংলা ছবিতে কেন, অন্য কোন ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে কে দেখেছেন? নিজের অভিনয় নেই বলে, সুপারস্টার দড়ি ধরে ভিড় সামলাচ্ছেন। এটাই তিনি। একজন খাঁটি বাঙালি, মাটির মানুষ, অথচ শিল্পীসত্তায়, প্রতিভায় যিনি পুরোদস্তুর বিশ্বজনীন, বিশ্বমানের।



Continue Reading

You might also like

Leave A Reply

Your email address will not be published.