সত্যজিতের শতবর্ষ: সত্যজিতের কাজের সব চেয়ে বড় কথা হল ওঁর টোটাল ডিসিপ্লিন


দীপঙ্কর দে

বলতে গেলে আমার প্রথম ছবিই সত্য়জিৎ রায়ের সঙ্গে। ১৯৭১-য়ে ‘সীমাবদ্ধ’। প্রথম হলেও কাজটা খারাপ দাঁড়ায়নি। প্রথম ছবিতে আমার কাজের পরিমাণটাও যদিও বেশ কম ছিল। সর্বসাকুল্যে মোট তিনদিনের।

এর বেশ কিছুদিন পরে,বছরপাঁচেকের মাথায় ‘জন অরণ্য’তে (jana aranya) ডাক পেলাম। তার পর কিন্তু একটা দীর্ঘ বিরতি। প্রায় পনেরো বছরের। কেন ঠিক জানি না। হতে পারে সেই সময়-পর্বে উনি যে ধরনের ছবি নিয়ে ভাবছিলেন হয়তো সেখানে  আমার জন্য কোনও জায়গা ছিল না। তাই নেননি।

পনেরো বছরের মাথায় এল সেই পর্বটা। এটাকে আমি ট্রিলজিও বলি। প্রথমে ‘গণশত্রু’ (১৯৯০)। সেখানে বেশ গুরুত্বপূর্ণ একটা চরিত্রই ছিল আমার জন্য। তার পরে একে একে ‘শাখাপ্রশাখা’ (১৯৯০) ও ‘আগন্তুক’ (১৯৯১)। সত্যজিতের সঙ্গে সর্বমোট এই পাঁচটি কাজের মধ্যে ‘আগন্তুক’ই আমার সব চেয়ে প্রিয় ছবি। 

আরও পড়ুন: টেকনিক, স্টাইল, অরা সব কিছুতেই উত্তমের কাছে হেরেই গেলেন কি সৌমিত্র?

অনেকের সঙ্গেই কাজ করেছি। অনেক ভাল ভাল পরিচালকের সঙ্গে। সত্যজিৎ (satyajit ray) ছাড়া যাঁর নাম করতে হয়, তিনি হলেন তপন সিনহা। তপনবাবুর সঙ্গে কাজ করতে গিয়েও অনেক কিছু শিখেছি। তবে সত্যজিতের বিষয়ে আলাদা করে যেটা বলার, সেটা হল ওঁর ডিসিপ্লিন। চিত্রনাট্য়ের ডিসিপ্লিন, আচার-ব্যবহারের ডিসিপ্লিন। একটা পরিপূর্ণ শৃঙ্খলাবদ্ধতা। আর সত্যজিৎ রায় তো তাঁর প্রথম ছবি থেকেই ‘সত্যজিৎ রায়’, ফলে আমরা যারা তাঁর সঙ্গে তখন কাজ করতে গিয়েছি, তারা প্রথম থেকেই নিজেকে ওঁর হাতে পুরোপুরি সঁপে দিয়েছি। কমপ্লিট সারেন্ডার। কেননা, জানতাম, ওখান থেকে যেটা হবে, সেটা সম্পূর্ণ নিখুঁত একটা ব্যাপার হবে। উনি আমাদের থেকে সেরাটা বার করে নেবেন।

সত্যি বলতে কী, সত্যজিৎ রায়  বা ওঁর মতো তথাকথিত অ-বাণিজ্যিক ছবির পরিচালকের সঙ্গে কাজ করলেই যে তকমাটা অনেক অভিনেতার গায়ে এঁটে যায়,  ওই ‘ডিরেক্টর্স আর্টিস্ট’ তকমাটা, ওটা অনেকে সম্পূর্ণ মানেন না; আমি কিন্তু কেরিয়ারের প্রথম থেকেই মেনে এসেছি, অভিনেতা মাত্রেই যে কোনও ছবিতে ‘ডিরেক্টর্স আর্টিস্ট’ই। 

আমি তো বাণিজ্যিক ছবিও কম করিনি। কখনও এই ধারণা থেকে বেরোইনি, বেরোতে পারিনি। ফলে, সত্যজিতের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে আলাদা করে অন্যরকম কিছু মনেও হয়নি আমার। মানে, ওই স্বাধীনতা কম বা ইম্প্রোভাইজ করার স্কোপ কম…এইরকম আর কী! বরং আমি বলব, উনি খুব কঠিন জায়গা বা জটিল সিটুয়েশন না হলে অভিনেতাকে নিজের মতোই করতে দিতেন। ক্বচিৎ নিজে অভিনয়  করে দেখাতেন এবং বলতেন যে, এরকম করো।

আবার পাশাপাশি এ-ও মনে করি, ব্যাপারটা শুধুই ওই ‘ডিরেক্টর্স আর্টিস্টে’র ছক দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। তা হলে তো আর আলাদা আলাদা ছবির জন্য আলাদা আলাদা অভিনেতারও প্রয়োজন পড়ে না; তা হলে সৌমিত্রকেও (soumitra chatterjee) সত্য়জিতের ১৪টি ছবিতে দেখা যেত না আর উত্তমকুমারকেও (uttam kumar) ডাকতেন না উনি!

আরও পড়ুন: তাঁর গানে চিরকাল একঝাঁক পাখিদের মতো কিছু রোদ্দুর

                                                                                                                                                                                    (অনুলিখন)   





Continue Reading

You might also like

Leave A Reply

Your email address will not be published.