সত্যজিৎ আমাদের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে সূর্য ছিলেন, অন্যদের আলোকিত করেছিলেন তিনি


মাধবী মুখোপাধ্য়ায়

আজকাল আমাদের নিজেদের কাজ নিয়ে এবং যাঁদের সঙ্গে কাজ করেছি, তাঁদের নিয়ে একই কথা বারবার বলতে হয়। মানুষ শুনতে চান, জানতে চান, পড়তে চান। তাই বলতে হয়। কিন্তু ব্য়াপারটা আমার বা আমাদের পক্ষে চর্বিত চর্বণও দাঁড়ায় কখনও-কখনও। সত্যজিৎ রায়ের  প্রসঙ্গেও বিষয়টি এক। সেই ‘মহানগর’, সেই ‘চারুলতা’, সেই ‘কাপুরুষ’। কিন্তু যে সময়টায় আমরা এসব কাজ করেছি, দুঃখের ব্য়াপার হল, সেই সময়ে কেউ এই ধরনের কাজ নিয়ে তত খোঁজপত্র করেনি। 

সত্যজিৎ (satyajit ray) প্রসঙ্গে বলতে বসে কেন এই প্রসঙ্গ টানলাম, তার কারণ আছে। আজ আমরা সত্যজিৎ-সত্যজিৎ করি বটে, কিন্তু উনি তখন ছবি বানিয়ে কোনও টাকাই উপার্জন করতে পারেননি। বরং পরবর্তী কালে ফেলুদা বা প্রফেসর শঙ্কু লিখে অনেক বেশি রোজগার করেছেন। কেন টাকার প্রসঙ্গ  তুললাম, তারও কারণ আছে। উনি টাকা রোজগার করতে পারেননি কারণ মানুষ তখন ওঁর ছবি দেখতেন না। কলকাতায় চলতই না ছবি। হল ফাঁকা! মানুষ নেননি। নিতে পারেননি। অথচ ওই সময়টায় যদি বাঙালি একটু সিরিয়াস হত, তা হলে হয়তো ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির এই দুরবস্থাটা তখন আমাদের দেখতে হত না।  

কিন্তু তা বলে কি সত্যজিৎ সেই সময়-পর্বে মেনস্ট্রিম ছবির বাণিজ্যের নিরিখে অনুজ্জ্বল নাম? ঠিক এইখানে এসে যদি বাণিজ্যের প্রসঙ্গটা একটু সরিয়ে রাখি, তবে দেখব, সেই সময়ে সত্যজিতের ছবির একটা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রভাব বাংলা ছবিকে (এবং সেই সূত্রে বাংলা ছবির বাণিজ্যকেও কিছুটা হয়তো) ঘুরপথে অনেকটাই সাহায্য করেছিল। তা হল, বাংলা মূলধারার ছবির মানকে তা অনেকটা উপরে তুলেছিল, উঠতে বাধ্য় করেছিল। ফলে প্রবল বাণিজ্যিক ছবিও তখন শিল্পবিচারে অনেক সমৃদ্ধ হত। এর পিছনে সত্যজিতের নান্দনিক ভাবনা অনেকাংশে প্রভাবশালী। এটা ওঁর খুবই বড় অবদান।

আরও পড়ুন: শেফালির টানে থিয়েটারে উত্তম কুমার

সত্যজিতের ছবি হলে না চলার কথা বলছিলাম। এই প্রসঙ্গে বলব, সেখানে ‘চারুলতা’ কিন্তু মূর্তিমান বিদ্রোহ। আমারই কয়েকবছর আগে ওঁর সঙ্গে করা ‘মহানগর’ও কিন্তু ততটা চলেনি। অথচ ‘চারুলতা’ বক্স অফিসেও দারুণ সাড়়া ফেলে দিয়েছিল। তার আগে সত্যজিতের ছবি কলকাতার হলগুলিতে না-চলার বিষয়ে ওঁর ইউনিটেরই এক প্রাচীন মানুষ মজা করে বলতেন, ওঁর ছবি শহরে তো চলে না, চলে ‘মফসসলে’! আমরা প্রথম-প্রথম শুনে খুব অবাক হতাম। পরে বুঝলাম, উনি ‘মফসসল’ বলতে বিদেশ ‘মিন’ করছেন! 

আমি যখন সত্যজিতের সঙ্গে কাজ করতে এলাম, সেটা ১৯৬২-৬৩ সাল; মানে, ‘মহানগর’-পর্ব; তখন আমার বয়স যত কমই হোক না কেন, আমি কিন্তু তখনই বেশ তৈরি হয়েই এসেছিলাম। কেননা তখনই আমার সঙ্গে ছিল মঞ্চ ও পর্দা মিলিয়ে অভিনয়ের লম্বা একটা ইতিহাস। আমি স্টেজে প্রচুর কাজ করেছি। সাম্প্রতিক কালের গ্রুপ থিয়েটার নয়, পাবলিক থিয়েটারে প্রচুর কাজ করেছি। যা ভাল না হলে দর্শক চিৎকার করে বন্ধ করে দিতেন। ওটা ছিল আমাদের কাছে কঠিন পরীক্ষা। আমি ওই পরীক্ষায় পাশ করেই সত্যজিতের কাছে এসেছি। আর সেখানে ততদিনে কাজ করে ফেলেছি কাদের কাদের সঙ্গে! শিশির ভাদুড়ী, ছবি বিশ্বাস! ছ’বছর থেকে তো অভিনয় করছি! ফলে, আমি সত্যজিতের কাছে শিখেছি অবশ্যই, তবে তা একেবারে নভিশ হিসেবে নয়।

সত্যজিতের সঙ্গে কাজ করার আগেই তো আমি কাজ করে ফেলেছি মৃণাল সেন (Mrinal Sen), ঋত্বিক ঘটকের (Ritwik Ghatak) সঙ্গেও! মৃণাল সেনের ‘বাইশে শ্রাবণ’ (১৯৬০), ঋত্বিক ঘটকের ‘সুবর্ণরেখা (১৯৬২)’ করে আমি ওঁর সামনে দাঁড়িয়েছি। পরে-পরে তো আরও অনেকের সঙ্গে কাজ করেছি। তপন সিনহা, তরুণ মজুমদার। আরও গুণী ও প্রতিভাবান পরিচালকেরাও ছিলেন। তবে এঁদের মধ্যে সত্যজিতের প্রসঙ্গে আলাদা করে একটা কথা বলতে পারি, উনি এক বিরল শিক্ষকের মতো খুব সহজে চিত্রনাট্য, চরিত্র ইত্যাদি বুঝিয়ে দিতে পারতেন। সেই স্কুল-কলেজে এক-একজন শিক্ষক আমরা পেতাম না, যাঁরা কঠিন বিষয়ও খুব সহজে বুঝিয়ে দিতে পারতেন, তেমন আর কী! তাতেই অভিনয়টা উতরে যেত। আর ‘অভিনয়’ বলছি বটে! কিন্তু এটা ভুল ধারণা যে, আমরা অভিনয় করতাম। আমরা আসলে চরিত্র যা যা করে,  স্রেফ সেগুলিই করে যেতাম। অনেকটা ওই ‘বিহেভ’ করা।

বাংলা তথা ভারতীয় ছবির প্রধান তিন পরিচালক– সত্যজিৎ, ঋত্বিক, মৃণালের মধ্যে আমি বলব, সত্যজিৎ আর মৃণালের মধ্যে এক দারুণ সংযম ছিল। এটা এঁদের দু’জনের কাজকে অনেকটা সমৃদ্ধ করেছিল। সত্যজিতের কোনও বিষয়ে কোনও লোভ ছিল না। ওঁর তো নিজের বাড়িও ছিল না! ছবি করে টাকা যে করতে পারেননি তা তো আগেই বলেছি। অথচ , যখন আমরা বিদেশে গিয়েছি, ওঁর ছবির কলাকুশলী হিসাবে ইংল্যান্ড-আমেরিকা গিয়েছি, তখন সেখানে আমরা ওঁর জন্যই কত সম্মান কত সুবিধা পেয়েছি। 

আজ সময়ের এতটা দূরত্বে এসে দাঁড়িয়েও বলব, বাংলা ছবিতে, বাংলা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে সত্যজিৎ রায় ছিলেন সূর্যের মতো! তাঁর একটা নিজস্ব দ্যুতি ছিল এবং তা দিয়ে তিনি সেই সময়ে অন্যদের আলোকিত করেছিলেন। 

আরও পড়ুন: সত্যজিতের শতবর্ষ: সত্যজিতের কাজের সব চেয়ে বড় কথা হল ওঁর টোটাল ডিসিপ্লিন

                                                                                                                                                                                  (অনুলিখন) 





Continue Reading

You might also like

Leave A Reply

Your email address will not be published.